রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা পরিষদ মাঠে প্রতিদিন ভোরে ও বিকেলে বেজে ওঠে প্রশিক্ষকের বাঁশি। মাঠজুড়ে বল নিয়ে ছুটছেন একদল স্বপ্নবাজ কিশোরী। বলের দখল নেওয়া থেকে শুরু করে সতীর্থকে নিখুঁত পাস—সবকিছুতেই তাদের একাগ্রতা স্পষ্ট। পাহাড়ের দুর্গম জনপদ থেকে উঠে আসা এই কিশোরীদের গড়ার কারিগর বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল কোচ সুইহলামং মারমা। ৫১ বছর বয়সী এই প্রশিক্ষক ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এই ফুটবল একাডেমি। শুরুর সেই ১৪ জন থেকে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২-এ। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা এসব কিশোরী এখানে আবাসিক ব্যবস্থাপনায় ফুটবল শিখছে। কেউ বল নিয়ে ছুটছে, কেউ সতীর্থকে পাস দিচ্ছে। মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে বাঁশি হাতে নির্দেশনা দিচ্ছেন কোচ। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কোচের নাম সুইহলামং মারমা (৫১)। সুইহলামং মারমা ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এখন সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৪২ জন।
দীর্ঘদিন পেশাদার কোচ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে সুইহলামং মারমার মনে হয়েছিল, পার্বত্য চট্টগ্রামের মেয়েদের মাঝে ফুটবলের জন্য ব্যাপক সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে।
সেই লক্ষ্য থেকে তিনি একাডেমিটি প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানে একটি ভাড়া বাসায় এই কিশোরীদের আবাসন কার্যক্রম চলছে, যার জন্য প্রতি মাসে তাকে ২০ হাজার টাকা গুনতে হয়।
একাডেমি পরিচালনায় শুরু থেকেই আর্থিক টানাপোড়েন ছিল তাঁর সঙ্গী। নিজের ও স্ত্রীর বেতনের একটি বড় অংশ ব্যয় করার পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও ও সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে তিনি খেলোয়াড়দের জুতা, জার্সি ও বলের চাহিদা পূরণ করছেন। আগে সব ব্যয় বিনা মূল্যে বহন করা হলেও গত বছর থেকে সক্ষমতা থাকা পরিবারগুলোর কাছ থেকে মাসিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে খেলোয়াড়দের বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হতো। সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একাডেমিকে এককালীন আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে।
একাডেমির সাফল্যের পরিধি এখন বেশ বিস্তৃত। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া আটজন কিশোরী জাতীয় দলের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রেও এই একাডেমির অবদান অনস্বীকার্য। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে ছয়জন, পুলিশে একজন, বিমানবাহিনীতে একজন এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৫০ জন খেলোয়াড় কোটায় নিয়োগ পেয়েছে। এ ছাড়া ফেন্সিং দলে আটজন, জুডোতে চারজন, সাইক্লিস্ট হিসেবে একজন এবং বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছে ছয়জন শিক্ষার্থী। ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, মনিকা চাকমা, আনাই মোগিনী ও আনুচিং মোগিনীর মতো তারকা ফুটবলারদের প্রশিক্ষণেও ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সহকারী কোচ হিসেবে যুক্ত ছিলেন সুইহলামং মারমা। আমি জাতীয় বয়সভিত্তিক দল থেকে চিঠি পেয়েছি। আমি দেশকে সেরা খেলাটা উপহার দিতে চাই।’।
একাডেমির স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি থেকে আসা আনিষা তঞ্চঙ্গ্যা জানায়, সে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করেছে। এখন সে আনসার একাডেমির ফেন্সিং টিমে খেলছে, তবে তার মূল লক্ষ্য জাতীয় ফুটবল দলে খেলার। খাগড়াছড়ির অর্কি চাকমা এবং রাঙামাটির বাঘাইছড়ির আকর্ষণী চাকমাও জানায়, সুইহলামং স্যার কেবল মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও অভিভাবকের মতো তাদের আগলে রাখেন। নিয়মিত জেলা ও আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ায় তাদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা দ্রুত বাড়ছে। কথা বলে জানা যায়, এ একাডেমির কিশোরীরা প্রতিদিন দুই বেলা অনুশীলন করে। পাহাড়ি গ্রাম থেকে এসে সুইহলামং স্যারের কাছে কঠোর অনুশীলন করেছি। কিন্তু অনুশীলনের বাইরে স্যার আমাদের অভিভাবকের মতো যত্ন নেন। স্যারের নিবিড় দিকনির্দেশনায় নিজেকে প্রতিদিন প্রস্তুত করছি, যেন ভবিষ্যতে দেশের সেরা খেলোয়াড় হতে পারি এবং রূপনা ও মনিকা আপাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারি।’। দরকার কেবল সঠিক দিকনির্দেশনা ও সঠিক পরিচর্যা। এই ধারাবাহিক সমর্থন ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে।
কোচ সুইহলামং মারমার মতে, পাহাড়ের মেয়েদের শারীরিক সক্ষমতা অনেক বেশি। তিনি মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই একাডেমি থেকে আগামী দিনে দেশের জন্য আরও অনেক তারকা ফুটবলার উঠে আসবে। স্থানীয় প্রশাসনও তার এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিব হোসেন জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ কিশোরীদের স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রী সরবরাহ এবং আবাসনে খাবারের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ইতিবাচক ধারায় সহায়তা করা হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরবে।’।

