ফুটবল বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আনুষ্ঠানিক ইতি টানলেন। ৪১ বছর বয়সে এসে ফুটবল মহাতারকার এই অবসরের ঘোষণা পর্তুগিজ ফুটবলের একটি গৌরবময় ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল। ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হওয়া রোনালদোর এই দীর্ঘ যাত্রা ২০২৬ সালের নভেম্বরে এসে পূর্ণতা পেল। এই সময়ের ব্যবধানে তিনি কেবল গোল মেশিন হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং পর্তুগালের ফুটবলের মানচিত্রই বদলে দিয়েছেন। ঘটনাটি তাঁর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি: একুশ বছরের নীল-সাদা গল্প। সেই যাত্রার শেষ হলো ২০২৬ সালের নভেম্বরে।
রোনালদোর এই অবসরের পেছনে কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সৃষ্ট তিক্ত বিরোধ এবং দলের হয়ে খেলার সুযোগ নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকর পরিস্থিতির বড় প্রভাব রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কোচ কথা রাখেননি।
বিশেষ করে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেদিন অধিনায়ক হয়েও রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট বেঞ্চে বসে থাকতে হয়, অথচ তার আগেই কোচের সঙ্গে সমঝোতা ছিল যে তাকে অন্তত ৩০ মিনিট খেলার সুযোগ দেওয়া হবে। এই ঘটনায় নিজের ক্ষোভ লুকিয়ে রাখতে পারেননি রোনালদো, যার জেরে এক পর্যায়ে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়তে হয় তাকে। কোচের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ ও পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে দেওয়া জেসুসের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরে ব্যক্তিগত আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলেও সংবাদমাধ্যমে জেসুসের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ তৈরি হয়। এত সব অর্জনের পর বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্তকে নিজের দীর্ঘদিনের গড়া ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
জাতীয় দলের জার্সিতে রোনালদোর অর্জন ও পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। তিনি ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬টি গোল করে আন্তর্জাতিক পুরুষ ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে আসীন রয়েছেন। তার হাত ধরেই ২০১৬ সালে পর্তুগাল প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় করে। এছাড়া ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও জিতেছে তার দল। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিরল কীর্তিও তার দখলে। মাঠের পারফরম্যান্সে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হয়ে থেকেছেন তিনি। ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুরুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তাঁর দখলে।
বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টিও তার অবসরের সিদ্ধান্তের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। যদিও ৪১ বছর বয়সেও তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তবুও বর্তমানের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবলে শারীরিক ধকল সামলানো আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছিল। এছাড়া পর্তুগাল দলে নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উঠে আসার বিষয়টিও তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি হয়তো চেয়েছেন ক্যারিয়ারের শেষ স্মৃতিটুকু একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড় হিসেবে সমর্থকদের মনে গেঁথে রাখতে। শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাঁকে প্রথম দিকে বিশ্রামে রাখা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে মাঠে নামাননি কোচ। অবশ্য বয়স বা শারীরিক সক্ষমতাকে অবসরের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও রোনালদো ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন এই তারকা। অর্থাৎ ফুটবল থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছেন না তিনি। ২৩ বছরের দীর্ঘ পথচলায় রোনালদো কেবল ট্রফি বা রেকর্ড জয় করেননি, বরং অগণিত তরুণকে ফুটবলের প্রতি অনুপ্রাণিত করেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সাত নম্বর জার্সিটি আজ থেকে পর্তুগালের ইতিহাসে এক অনন্য স্মৃতির নাম হয়ে রইল। যে খেলোয়াড় দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন বয়ে বেড়িয়েছেন, গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড, তাঁর বিদায় তাই কেবল একজন ফুটবলারের অবসর নয়; এটি একটি যুগের সমাপ্তি।

