একজন জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খোকন হাঁসদা। তাঁর মতে, বাংলাদেশ মানে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সুনিশ্চিত। তিনি এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেন, যেখানে পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে মানুষ হিসেবেই সবার প্রাপ্য সম্মান বজায় থাকবে। একজন জেন–জি হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমার চোখে ভেসে ওঠে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা। ঘটনাগুলো হয়তো খুব ছোট, কিন্তু আমার কাছে এগুলো একটি বড় সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আমি দুই চুমুক দেওয়ার পর হোটেলের মালিক এসে আমার হাত থেকে কাপটি কেড়ে নেন।
নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে খোকন জানান, বৈষম্য এখনো সমাজের গভীরে রয়ে গেছে। রাজশাহীর তানোরের দরগাডাঙ্গা এলাকায় এক চায়ের দোকানে তিনি যে বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন, তা আজও তাঁকে পীড়া দেয়। পরিচয় পাওয়ার পর দোকানের মালিকের কাপ বদলে দেওয়া কিংবা করোনাকালে দিনমজুরের কাজ করার সময় প্লেট না দিয়ে গামছার ওপর খাবার পরিবেশনের মতো ঘটনাগুলো তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে। অথচ যখনই পরিবেশনকারীরা জেনেছেন যে তাঁরা শিক্ষার্থী, তখনই আচরণের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। এই বাস্তবতা তাঁকে প্রশ্ন করতে শেখায়—সম্মান পেতে কেন মানুষকে নিজের পরিচয় বা শিক্ষাগত যোগ্যতা জাহির করতে হবে? দোকানের কর্মচারী আমাকে একটি ভালো কাপে চা দিয়েছিলেন। এরপর অন্য একটি পুরোনো, আলাদা কাপে চা দেন। ঘটনাটি আমাকে এতটাই অপমানিত করেছিল যে পরে আর চা খাওয়ার রুচি হয়নি। কাপ বদলে দেওয়ার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম এই উপলব্ধিতে যে আমার পরিচয়ের কারণে আমাকে অন্যদের থেকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে। আমাদের গ্রামের কয়েকজন সেখানে কাজ করতে গিয়েছিলাম।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বীকৃতি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি। খোকন হাঁসদার ভাষায়, আমি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ আত্মপরিচয় ও স্বীকৃতির দাবিকে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত হবে। সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও সম্মানজনক অবস্থান তৈরি হওয়া জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর ভাবনা স্পষ্ট; সনদসর্বস্ব বা মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার পরিবর্তে বর্তমান সময়োপযোগী সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী শিক্ষার দাবি তুলেছেন তিনি। এমন শিক্ষা দরকার যা মানুষকে কেবল কর্মী হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখছেন, যেখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনই আসল সমাধান।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস না করার আহ্বান জানান তিনি। একজন জেন-জি হিসেবে তরুণদের কণ্ঠস্বর যেন রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্ব পায়, সেই প্রত্যাশাও তাঁর রয়েছে। মতের অমিল থাকলেও যুক্তি দিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করার সুযোগ থাকাকে তিনি দেশপ্রেমের অংশ মনে করেন।
খোকন হাঁসদার স্বপ্নের বাংলাদেশে কোনো দিনমজুর, কৃষক বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে নিজেদের মর্যাদা প্রমাণের লড়াই করতে হবে না। মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং সমান সুযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি উন্নত ও সমতার বাংলাদেশই হোক আগামী দিনের লক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের পরিচয় নিয়ে বুক ফুলিয়ে বাঁচতে পারবে।

