মেটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এবং তাঁর স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের তিন মেয়ে ম্যাক্সিমা, অগাস্ট ও অরেলিয়া বড় হলেও তাঁরা বাবা-মায়ের বিপুল সম্পদের সিংহভাগ উত্তরাধিকার হিসেবে পাবেন না। ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রথম সন্তান ম্যাক্সিমার জন্মের পরপরই এই দম্পতি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের ফেসবুকের ৯৯ শতাংশ শেয়ার জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করবেন। ফরচুন ম্যাগাজিনের তথ্যের ভিত্তিতে সেলেব ডটকম এই সংবাদ প্রকাশ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুসারে, তাঁর সম্পদের বড় অংশ সন্তানদের দেওয়ার পরিবর্তে জনকল্যাণে খরচ করা হবে।
সেই সময় জাকারবার্গের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। নিজেদের মেয়ের জন্মের পর তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক খোলাচিঠিতে এই দম্পতি লিখেছিলেন, সব বাবা-মায়ের মতো তাঁরাও চান তাঁদের সন্তান এমন একটি পৃথিবীতে বেড়ে উঠুক, যা বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও বাসযোগ্য। মানুষের সম্ভাবনার বিকাশ এবং বিশ্বজুড়ে সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তাঁরা এমন বড় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। চিঠিতে তাঁরা লিখেছিলেন, ‘সব মা-বাবার মতো আমরাও চাই, তুমি আজকের চেয়ে ভালো পৃথিবীতে বড় হও।’।
এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যান প্রতিষ্ঠা করেন ‘চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ’ বা সিজেডআই। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই শিক্ষা, চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ করার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বিশ্বাস, এই খাতে বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অবারিত সুযোগ তৈরি করবে। বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেটের মতো বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের মতোই জাকারবার্গের লক্ষ্য হলো, বিপুল সম্পদ যেন কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত না থাকে।
সিজেডআই সাধারণ দাতব্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। প্রচলিত ব্যক্তিমালিকানাধীন দাতব্য ফাউন্ডেশনের পরিবর্তে সিজেডআই সীমিত পরিসরে কোম্পানির মতো পরিচালিত হচ্ছে।
এটি একটি সীমিত পরিসরের কোম্পানি হিসেবে কাজ করে, ফলে দাতব্য অনুদানের বাইরেও সরাসরি ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী কাজে বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকে এই প্রতিষ্ঠানের। শুরুর দিকে আবাসন সংকট, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে গুরুত্ব দিলেও বর্তমানে সিজেডআইয়ের কর্মপরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের গবেষণায় তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যারা পৃথিবীতে আসবে, তাদের জীবনমান উন্নয়নেও এখন থেকেই বিনিয়োগ করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সংস্থাটির অগ্রাধিকার বদলেছে।
জাকারবার্গ দম্পতির মতে, কেবল বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোই যথেষ্ট নয়, বরং ভবিষ্যতের কথা ভেবে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। তাঁদের এই সিদ্ধান্তে বর্তমানের সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের হাতে গচ্ছিত না রেখে বৃহত্তর মানবকল্যাণে ব্যবহারের একটি নতুন উদাহরণ তৈরি হয়েছে। এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে জাকারবার্গ ও প্রিসিলা চ্যান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দাতার কাতারে নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন।

