বিশ্বের বর্তমান বিভক্ত পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাসিম আল-থানী। যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ‘একটি বিভক্ত বিশ্বে সমৃদ্ধি: ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ এবং বৈশ্বিক প্রভাবের মানচিত্র পুনর্নির্ধারণ’ শীর্ষক এক বিশেষ বক্তৃতায় তিনি এই আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর ছোট দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি প্রচলিত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বিভাজনকে বর্তমান বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। এর পরিবর্তে তিনি ‘সমৃদ্ধ রাষ্ট্র’ (Prosperous States) ধারণার প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, যেসব দেশ উন্নত মানবসম্পদ, আধুনিক অবকাঠামো এবং টেকসই অর্থনৈতিক মডেলের মাধ্যমে সফল হয়েছে, তাদের দায়িত্ব কেবল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিতভাবে অবদান রাখা।
১৯৪৫ পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বশান্তি কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি আইন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং উন্মুক্ত বাজারের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে যুক্ত হওয়ার ফলে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো আধিপত্যবাদী শক্তির কবল থেকে মুক্ত হয়েছে এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগেও শান্তি ও নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি মুষ্টিমেয় কিছু শক্তির হাতে রয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। এর ফলে উদ্ভূত ভারসাম্যহীনতা আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান যে, সরাসরি সংঘাতে জড়িত নয় এমন দেশগুলোকেও এর নেতিবাচক প্রভাব ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ এবং জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এর বড় উদাহরণ।
কাতার তার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে নিজস্ব সক্ষমতা এবং বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। কাতার মনে করে, দেশের ভবিষ্যৎ কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না। এই নীতি অনুসরণ করেই কাতার দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেন যে, শান্তিপ্রিয় কাতার এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা তাদের শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।
বক্তব্যের শেষে তিনি স্পষ্ট করেন যে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এটি অপরিহার্য শর্ত। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা এড়াতে কাতার তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তিনি বিশ্বনেতাদের নিষ্ক্রিয় দর্শক না হয়ে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

