নাবলুসে ইউসুফের মাজার ঘিরে ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতি, ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান

অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মাজারকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শহরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিতে অভিযান চালিয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়িঘরেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। নাবলুসের বাইরেও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

নাবলুসের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ইউসুফের মাজার এবং আসকার আল-বালাদ এলাকার বেশ কিছু বাড়িঘরে সেনারা তল্লাশি চালায়। একই দিনে শহরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বুরিন গ্রামে টানা চতুর্থ দিনের মতো ইসরায়েলি সামরিক অভিযান পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, অভিযানের সময় সেনারা জোরপূর্বক বাড়িতে ঢুকে তছনছ করেছে। ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার তথ্যমতে, একই দিনে বেথলেহেম এবং তুলকারেম অঞ্চলের কাফর আবুশ ও কাফর সুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করা হয়েছে। তবে ইউসুফের মাজারে অভিযানের সময় কাউকে আটকের তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্যসূত্র: ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা, আলজাজিরা, আল-কুদস, নিয়ার ইস্টার্ন আর্কিওলজি, মিডল ইস্ট আই, জার্নাল অব হলি ল্যান্ড অ্যান্ড প্যালেস্টাইন স্টাডিজ, জাতিসংঘের নথি ও আনাদোলু এজেন্সি।

নাবলুসের পূর্ব দিকে অবস্থিত এই স্থাপনাটি মুসলমানদের কাছে মাকাম ইউসুফ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি নবী জোসেফের সমাধিস্থল হিসেবে গণ্য। মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও সামারিটান—সব সম্প্রদায়ের কাছেই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও এর প্রকৃত সমাধিস্থল নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় গবেষক লোয়াই আবু আলসাউদ ও আমের আল-কুব্বাজ উল্লেখ করেছেন, বর্তমান স্থাপনাটি মূলত উসমানীয় আমলের ইসলামি স্থাপত্যশৈলীর বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ইউসুফ (আ.)-এর দেহাবশেষ থাকার কোনো জোরালো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এর প্রকৃত সমাধিস্থলগত পরিচয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়া কোনো স্থাপনার পরিচয়কে এককভাবে প্রতিষ্ঠা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

এই স্থাপনাটি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত।

২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার শুরুর দিকে মাজারটি ভয়াবহ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।

তৎকালীন অস্থিরতার কারণে সেখানে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রত্যাহার করে এর নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার একটি সমঝোতা হয়েছিল।

যদিও পরবর্তীতে স্থাপনাটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল।

জাতিসংঘের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০০ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের স্থায়ী প্রতিনিধি একটি চিঠিতে সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সমঝোতার বিবরণ দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের সংঘাতের পরেও মাজারটি সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ হয়েছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০০০ সালের সংঘর্ষ ও মাজারটির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইতিহাস। জাতিসংঘে ইসরাইলের স্থায়ী প্রতিনিধির ৭ অক্টোবর ২০০০ তারিখের একটি চিঠিতে সে সময়কার ঘটনা ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। ইউসুফের মাজারের অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওই চুক্তিতে বিশেষ দিকনির্দেশনা ছিল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বারবার প্রবেশ কেবল ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিকেও জোরালো করছে। তখন মাজারটিতে ইসরাইলি নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

গত কয়েক মাসে মাজারটিকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর শত শত বসতি স্থাপনকারী সামরিক প্রহরায় মাজারে প্রবেশ করে ধর্মীয় আচার পালন করে। সে সময় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে ঘরবাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ছাদে স্নাইপার মোতায়েনের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া চলতি বছরের ১৩ মে একই রকম ঘটনা ঘটেছিল, যা স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করেছিল। তবে ৩০ অক্টোবরের ঘটনাটি ভিন্ন; এদিন বসতি স্থাপনকারীদের বদলে সেনাবাহিনী নিজেই সরাসরি অভিযান পরিচালনা করেছে। ১৩ মে ২০২৬ তারিখেও একই স্থানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশের খবর প্রকাশ করে আনাদোলু এজেন্সি। সামরিক অভিযান যদি স্থানীয় মানুষের চলাচল, শিক্ষা, বাড়িঘরের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তার প্রভাব একটি স্থাপনার সীমানা ছাড়িয়ে পুরো সমাজে বিস্তৃত হয়। ঐতিহ্য সংরক্ষণই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। ৩০ অক্টোবরের অভিযান সেই দীর্ঘদিনের সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলে রয়েছে, যা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ ও ৫৩ অনুচ্ছেদে বেসামরিক ব্যক্তিদের সুরক্ষা এবং সম্পত্তি ধ্বংস না করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন এবং এর প্রোটোকল অনুযায়ী সশস্ত্র সংঘাতের সময় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষা করা দখলদার শক্তির বাধ্যবাধকতা। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ২৭ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং ৫৩ অনুচ্ছেদে দখলদার শক্তির দ্বারা ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এখানে ধর্মীয় স্থাপনার সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অধিকার পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

নাবলুসের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বুরিন, বেথলেহেম ও তুলকারেম অঞ্চলে পরিচালিত সমান্তরাল অভিযানগুলো প্রমাণ করে যে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি কতটা অস্থির। সামরিক অভিযানের নামে বাড়িঘরে তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং ধর্মীয় আচার পালনের নামে স্থানীয় জনজীবনে হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলের জননিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ধর্মীয় সহনশীলতা ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং স্থানীয় অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য। ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দাবি ও বিশ্বাস কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সংরক্ষিত হবে, তা আজ বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব, স্থানটির ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান করা এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক পরিচয় সম্পর্কে প্রমাণনির্ভর থাকা—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। দুটি ঘটনাকে এক করে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি অস্পষ্ট হয়ে যাবে। এ ধরনের স্থাপনা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, নিরপেক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর প্রবেশাধিকার এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিরোনাম :
নারায়ণগঞ্জে গ্যারেজে রাখা বাসে আগুন: নাশকতার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ নাবলুসে ইউসুফের মাজার ঘিরে ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতি, ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান মিরপুরে পোশাক শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, মেট্রোরেলের ১১ নম্বর স্টেশন বন্ধ গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের সংঘর্ষ তুরস্কের জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারওয়ান বাজারে বাটার জুতা: সারা বছরই মিলছে বিশাল মূল্যছাড় ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন হামলা, হরমুজে আতঙ্ক আন্দোলনের নামে সহিংসতায় ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খেলা দেখিবেন টিভিতে: মাঠে নামছে বার্সেলোনা, বায়ার্ন ও পিএসজি সাফ শিরোপা জয়ের বড় স্বপ্ন দেখছে ফেভারিট বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জে গ্যারেজে রাখা বাসে আগুন: নাশকতার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ নাবলুসে ইউসুফের মাজার ঘিরে ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতি, ইসরায়েলি সেনাদের অভিযান মিরপুরে পোশাক শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, মেট্রোরেলের ১১ নম্বর স্টেশন বন্ধ গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের সংঘর্ষ তুরস্কের জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কারওয়ান বাজারে বাটার জুতা: সারা বছরই মিলছে বিশাল মূল্যছাড় ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন হামলা, হরমুজে আতঙ্ক আন্দোলনের নামে সহিংসতায় ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খেলা দেখিবেন টিভিতে: মাঠে নামছে বার্সেলোনা, বায়ার্ন ও পিএসজি সাফ শিরোপা জয়ের বড় স্বপ্ন দেখছে ফেভারিট বাংলাদেশ