কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার নির্বাচনী হলফনামা, আয়কর রিটার্ন এবং আর্থিক তথ্যের সঙ্গে বাস্তব নথিপত্রের ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিরাজুল ইসলাম নামের এক ভোটার গত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে আমির হামজার বিরুদ্ধে মোট ১৪ ধরনের তথ্য গোপন ও ভুল তথ্য প্রদানের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
আবেদনকারীর তথ্যমতে, মুফতি আমির হামজার দাখিল করা নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের তথ্যের সাথে তার সম্পত্তিসংক্রান্ত প্রকৃত নথির কোনো মিল নেই। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন তারিখে তার ব্যাংক হিসাবে কোনো টাকা নেই বলে আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করা হলেও, বাস্তবে ওই দিন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কুষ্টিয়া শাখায় (হিসাব নম্বর: ২০৫০১৩৩০২০২৬২৭৪১৭) প্রায় ৬৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ টাকা জমা ছিল। এ ছাড়াও নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় তিনি ব্যাংকের নাম ও হিসাব নম্বর উল্লেখ না করে তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। অভিযোগ রয়েছে, মুফতি আমির হামজা প্রতিটি জুমার নামাজে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা করে সম্মানী গ্রহণ করেন, যা তার নিজের স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তিনি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্মানী পেয়ে থাকেন। অথচ আয়কর রিটার্নে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা, যা মূলত হামজা এন্টারপ্রাইজের কাপড় ও বই ব্যবসার আয় হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। এই আয়গুলো ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য হলেও হলফনামায় এর কোনো উল্লেখ নেই। আবেদনে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি, ওয়াজ মাহফিল ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল থেকে আয়, নগদ অর্থ, কৃষি ও আবাসিক সম্পত্তি, স্ত্রীর সম্পদ, গাড়ি, বাড়িভাড়া, পারিবারিক ব্যয় এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জমিটির মূল্য ছয় লাখ টাকা, যার মধ্যে স্ত্রীর অংশের মূল্য ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নগদ অর্থের হিসাবেও বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে।
হলফনামায় আমির হামজা নগদ ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা দেখালেও, আয়কর রিটার্নে এই অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করেছেন ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। এই দুই নথির মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ টাকার পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। একইভাবে স্ত্রীর সম্পদের তথ্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। হলফনামায় স্ত্রী তামান্না সুলতানার ১২ কাঠা কৃষিজমির মূল্য ২ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে, অথচ স্ত্রীর নিজস্ব আয়কর রিটার্নে ওই জমির পরিমাণ ১২০ শতাংশ এবং মূল্য ১৭ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ জমিতে ১০০ শতাংশ এবং মূল্যে ১৫ লাখ টাকার পার্থক্য দেখা গেছে।
তদন্ত আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ৬৪৯৮/২০২৫ দলিল নম্বর অনুযায়ী, প্রায় ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কেনার তথ্য হলফনামায় গোপন করা হয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়া শহরের রাহিনী মৌজায় ২০১৪ সালের ২৭৭৬ নম্বর দলিলে আমির হামজার নামে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ জমি রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। এই জমির কোনো তথ্যও নির্বাচনী হলফনামা বা আয়কর রিটার্নে পাওয়া যায়নি।
বাড়িভাড়া ও মোটরযান নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যের অভিযোগও রয়েছে। হলফনামায় স্ত্রীর আয় হিসেবে বাড়িভাড়া থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেখানো হলেও, স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানাধীন ওই বাড়ির কোনো আয় আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়নি। বিদ্যুৎ বিল ও হোল্ডিং ট্যাক্স মুফতি আমির হামজার নামে থাকলেও তা লুকানো হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৯-১৭৫৭ নম্বরের একটি গাড়ি ২৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কেনার তথ্য হলফনামায় থাকলেও, গাড়িটির তথ্য আয়কর রিটার্ন থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া শহরে নিজের নামে থাকা একটি আবাসিক প্লটের তথ্য গোপনের অভিযোগও রয়েছে।
নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রেও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৪ লাখ টাকা। এর বাইরে ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ব্যাংক হিসাব থেকে আরও ৩৮ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়েছে, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২ লাখ টাকা। আবেদনকারীর অভিযোগ, এই ব্যয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ব্যয়ের সীমাকে অতিক্রম করেছে। এই সকল অভিযোগের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তিনি।

